মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন
আহমেদ আকবর, দক্ষিণ সুরমা সিলেট :
সারাদেশের পাড়া-মহল্লার মুদির দোকান, চায়ের দোকান, এমনকি মোটরসাইকেল মেকানিংকের ওয়ার্কশপেও এখন অবাধে বিক্রি হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার। নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল-ডালের মতোই সাজিয়ে রাখা হচ্ছে এই বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ। কিন্তু এভাবে লাইসেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন ছাড়া জনবহুল স্থানে সিলিন্ডার মজুদ ও বিক্রি কতটা যৌক্তিক আর আইনই বা কী বলে?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র।কতটা যৌক্তিক এই ব্যবসা?বিশেষজ্ঞ এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, মুদি বা চায়ের দোকানের মতো ছোট ও জনাকীর্ণ জায়গায় গ্যাস সিলিন্ডার রাখা মোটেও যৌক্তিক বা নিরাপদ নয়।চায়ের দোকান: যেখানে সারাক্ষণ উন্মুক্ত আগুন বা চুলা জ্বলে, তার পাশে সিলিন্ডার রাখা মানে যেকোনো মুহূর্তে বড় বিস্ফোরণকে আমন্ত্রণ জানানো।
মোটরসাইকেল ওয়ার্কশপ: এখানে লোহা কাটা, ঝালাই বা ওয়েল্ডিংয়ের কাজ হয়। ওয়েল্ডিংয়ের সামান্য স্ফুলিঙ্গ সিলিন্ডারের সংস্পর্শে এলে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে।
নিরাপত্তাহীনতা: এসব দোকানে কোনো অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা (Fire Extinguisher) থাকে না। ফলে সামান্য গ্যাস লিকেজ থেকে আগুন লাগলে তা নেভানোর কোনো সুযোগ থাকে না।আইনি নিয়ম-কানুন ও সরকারি নীতিমালাবাংলাদেশে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন, মজুদ ও বিক্রির জন্য সুনির্দিষ্ট কঠোর আইন রয়েছে, যা এই সাধারণ দোকানদাররা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন।
১. লাইসেন্স বাধ্যতামূলক: ‘তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বিধিমালা, ২০০৪’ এবং ‘গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা, ১৯৯১’ অনুযায়ী, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের বৈধ লাইসেন্স ছাড়া এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবসা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের কম মজুদ করা গেলেও বাণিজ্যিক বিক্রির জন্য বিস্ফোরক লাইসেন্স ও ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক।
২. দোকানের পরিকাঠামো: আইন অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির দোকান বা গুদাম অবশ্যই পাকা বা আধা-পাকা মেঝেসহ সুরক্ষিত ঘর হতে হবে। রাস্তা বা ফুটপাতে সিলিন্ডার সাজিয়ে রাখা দণ্ডনীয় অপরাধ।
৩. ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র: দোকান বা মজুদাগারে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা থাকতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অনাপত্তিপত্র (Clearance) থাকতে হবে।
৪. কঠোর শাস্তির বিধান: ২০০৩ সালের দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে বিস্ফোরক বা দাহ্য পদার্থের ব্যবসা করলে অপরাধীর অনূর্ধ্ব ৩ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং প্রতিষ্ঠানের সমস্ত মালামাল বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
সংকটের মূল কারণ ও প্রতিকারখুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, ডিলারদের কাছ থেকে সহজে সিলিন্ডার পাওয়া যায় এবং ক্রেতারাও হাতের কাছে খোঁজেন, তাই তারা বাড়তি আয়ের জন্য এই ব্যবসা করছেন।
তবে সচেতন মহল একে দেখছেন প্রশাসনের নজরদারির অভাব হিসেবে।জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব অবৈধ সিলিন্ডার দোকানের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত (Mobile Court) পরিচালনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
অন্যথায় এই ‘টাইম বোম্ব’গুলো যেকোনো সময় কেড়ে নিতে পারে অসংখ্য তাজা প্রাণ।